Skip to main content

হিজরতের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস: মক্কা থেকে মদিনা। The Complete History of Hijrah: From Makkah to Madinah

 


​১. হিজরতের প্রেক্ষাপট ও ঐশী নির্দেশ (The Background)

​মক্কায় তেরো বছর দাওয়াত দেওয়ার পর কুরাইশদের অত্যাচার চরমে পৌঁছায়। যখন মদিনার আনসাররা 'বায়াতুল আকাবা'-তে ইসলামের শপথ গ্রহণ করেন, তখন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের মদিনায় হিজরতের অনুমতি দেন। কুরাইশরা যখন দেখল ইসলাম মদিনায় শক্তিশালী হচ্ছে, তখন তারা দারুন-নাদওয়ায় (সংসদ ভবন) বসে সিদ্ধান্ত নিল যে, নাউযুবিল্লাহ, তারা নবী (সা.)-কে হত্যা করবে।

  • ​রেফারেন্স: "আর স্মরণ করো, যখন কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিল তোমাকে বন্দী করার জন্য, অথবা তোমাকে হত্যা করার জন্য অথবা তোমাকে বের করে দেওয়ার জন্য..." (সূরা আল-আনফাল: ৩০)।

​২. হত্যার ষড়যন্ত্র ও আলী (রা.)-এর ত্যাগ (The Conspiracy)

​প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবক তলোয়ার নিয়ে নবী (সা.)-এর ঘর ঘেরাও করে। আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে নবী (সা.)-কে সেই রাতেই মক্কা ছাড়ার নির্দেশ দেন। নবী (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে তাঁর বিছানায় নিজের সবুজ চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকতে বলেন, যাতে আমানতগুলো মক্কাবাসীদের কাছে ফেরত দেওয়া যায়।

  • ​ঐশী অলৌকিকতা: নবী (সা.) ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সূরা ইয়াসীনের শুরুর আয়াতগুলো পাঠ করে এক মুঠো ধুলো ছুঁড়ে মারেন, ফলে ঘেরাওকারী ঘাতকরা অন্ধের মতো হয়ে যায় এবং তিনি তাদের চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যান।

​৩. সাওর গুহায় আশ্রয় (Refuge in Cave Thawr)

​নবী (সা.) এবং তাঁর পরম বন্ধু আবু বকর (রা.) মদিনার উল্টো দিকে 'সাওর' পাহাড়ের গুহায় তিন দিন ও তিন রাত অবস্থান করেন। কুরাইশরা যখন গুহার মুখে চলে আসে, তখন আবু বকর (রা.) ভীত হয়ে পড়লে নবী (সা.) তাকে আশ্বস্ত করেন।

  • ​রেফারেন্স: "তুমি যদি তাকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছেন, যখন কাফেররা তাকে বের করে দিয়েছিল... সে তার সাথীকে বলছিল: তুমি চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।" (সূরা আত-তাওবাহ: ৪০)।

​৪. সুরাকার পশ্চাদ্ধাবন (The Pursuit of Suraqa)

​মক্কার কাফেররা নবী (সা.)-কে জীবিত বা মৃত ধরার জন্য ১০০ উটের পুরস্কার ঘোষণা করে। সুরাকা বিন মালিক তাদের খুঁজে পেয়ে ঘোড়া নিয়ে আক্রমণ করতে যায়, কিন্তু তিনবারই তার ঘোড়ার পা বালিতে গেঁথে যায়। তখন সে বুঝতে পারে যে কোনো অলৌকিক শক্তি নবী (সা.)-কে রক্ষা করছে। তিনি সুরাকাকে ক্ষমা করেন এবং পারস্য সম্রাটের স্বর্ণের কঙ্কন পরার সুসংবাদ দেন।

  • ​রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকীব, হাদীস নং ৩৯০৬।

​৫. উম্মে মা’বাদের তাবু (The Tent of Umm Ma’bad)

​মরুভূমি পাড়ি দেওয়ার সময় তাঁরা উম্মে মা’বাদ নামক এক মহিলার তাবুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে একটি দুর্বল বকরি ছিল যা দুধ দিতে পারত না। নবী (সা.) আল্লাহর নাম নিয়ে বকরিটির ওলান স্পর্শ করলে তা দুধে পূর্ণ হয়ে যায় এবং সবাই তৃপ্তিসহ পান করেন। এটি হিজরতের অন্যতম বড় মুজিযা।

​৬. কুবাতে প্রথম মসজিদ (First Mosque in Quba)

​মদিনায় ঢোকার আগে নবী (সা.) মদিনার উপকণ্ঠ 'কুবা' নামক স্থানে কয়েকদিন অবস্থান করেন। সেখানে তিনি ইসলামের প্রথম মসজিদ 'মসজিদে কুবা' নির্মাণ করেন। হযরত আলী (রা.) মক্কায় আমানত বুঝিয়ে দিয়ে সেখানে নবী (সা.)-এর সাথে যোগ দেন।

​৭. মদিনায় ঐতিহাসিক পদার্পণ (Arrival in Madinah)

​অবশেষে ১২ই রবিউল আউয়াল নবী (সা.) মদিনায় প্রবেশ করেন। মদিনার আনসাররা 'তলায়াল বাদরু আলাইনা' গেয়ে নবী (সা.)-কে স্বাগত জানান। মদিনার প্রতিটি মানুষ চাইছিল নবী (সা.) তাদের ঘরে আতিথ্য গ্রহণ করুন। নবী (সা.) বললেন, "আমার উটটিকে ছেড়ে দাও, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট।" উটটি হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.)-এর ঘরের সামনে গিয়ে বসে পড়ে।

​English Version: The Complete Journey of Hijrah

​1. Divine Permission and Background

​After 13 years of persecution in Makkah, the Prophet (PBUH) received divine permission to migrate to Madinah after the people of Madinah (the Ansar) pledged their loyalty at Aqaba. The Quraish, fearing the growth of Islam, plotted to assassinate the Prophet (PBUH) at Dar-un-Nadwa.

  • ​Ref: "And [remember, O Muhammad], when those who disbelieved plotted against you to restrain you or kill you or evict you..." (Surah Al-Anfal: 30).

​2. The Night of Migration and Ali (RA)

​On the night of the assassination attempt, the Prophet (PBUH) instructed Ali (RA) to sleep in his bed to return the trusts (Amanah) to the people of Makkah. The Prophet (PBUH) walked past the assassins while reciting Surah Yasin, casting dust toward them, which rendered them unable to see him.

​3. Three Days in Cave Thawr

​The Prophet (PBUH) and Abu Bakr (RA) took refuge in Cave Thawr for three days. When the Quraish trackers reached the mouth of the cave, Abu Bakr (RA) grew anxious. The Prophet (PBUH) comforted him.

  • ​Ref: "Do not grieve; indeed Allah is with us." (Surah At-Tawbah: 40).

​4. Suraqa bin Malik’s Pursuit

​The Quraish offered a reward of 100 camels for the Prophet’s capture. Suraqa bin Malik pursued them, but every time he got close, his horse’s legs sank into the hard sand. Realizing the Prophet (PBUH) was protected by Allah, he begged for forgiveness.

  • ​Ref: Sahih Bukhari, Hadith 3906.

​5. Miracle at Umm Ma’bad’s Tent

​During the journey, they stopped at the tent of Umm Ma’bad. They found a weak goat that yielded no milk. By the blessing of the Prophet (PBUH), the goat produced abundant milk, feeding everyone in the caravan.

​6. The First Mosque in Quba

​Before entering Madinah, the Prophet (PBUH) stayed at Quba. Here, he built the first mosque in Islamic history—Masjid al-Quba. Ali (RA) joined them here after completing his duties in Makkah.

​7. Grand Entry into Madinah

​On 12th Rabi-ul-Awwal, the Prophet (PBUH) entered Madinah amidst joyful celebrations. He let his camel decide where he would stay, saying, "Let her go, for she is commanded by Allah." The camel knelt at the house of Abu Ayyub al-Ansari (RA).

​সূত্র: সীরাতে ইবনে হিশাম, আর-রাহীকুল মাখতূম, সহীহ বুখারী।

Comments

Popular posts from this blog

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা (Greatest Teachings of Prophet Muhammad PBUH)

  রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল মানবতার জন্য এক জীবন্ত মুজিজা। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা হলো উত্তম চরিত্র এবং ক্ষমা। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।" তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে শত্রুকেও ক্ষমা করতে হয়, যা মক্কা বিজয়ের দিন প্রমাণিত হয়েছিল। এছাড়া তিনি শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন (সুনানে ইবনে মাজাহ)। তাঁর প্রতিটি শিক্ষা কোরআনের বাস্তব প্রতিফলন, যা আজও বিশ্ব শান্তির একমাত্র পথ। ​ [English] The life of Prophet Muhammad (PBUH) was a living miracle for humanity. Among his greatest teachings are noble character and forgiveness. In a Sahih Bukhari Hadith, it is stated: "The best among you are those who have the best manners and character." He taught how to forgive even the worst enemies, as proven during the Conquest of Mecca. Furthermore, he instructed to pay a worker's wages before their sweat dries (Sunan Ibn Majah). His every teaching is a practical reflection of the Quran,...

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): আমাদের ভবিষ্যত কি হুমকির মুখে? (Artificial Intelligence: Is Our Future in Danger?)

  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি। এটি মানুষের মতো চিন্তা করার ক্ষমতা রাখে এবং জটিল সব সমস্যার সমাধান মুহূর্তেই করে ফেলে। চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) বা মিডজার্নির মতো এআই টুলগুলো আমাদের কাজকে সহজ করে দিলেও মানুষের চাকরির ক্ষেত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এআই মানুষের জায়গা দখল করবে না, বরং যারা এআই ব্যবহার করতে জানে তারা অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকবে। প্রযুক্তির এই বিপ্লবকে সতর্কতার সাথে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ​ [English] Artificial Intelligence (AI) is the most discussed technology in the world today. It has the ability to think like humans and solve complex problems in an instant. While AI tools like ChatGPT or Midjourney make our work easier, questions are being raised about human job security. Experts believe that AI will not replace humans; rather, those who know how to use AI will stay ahead of others. It is wise to embrace this technological revolution with caution.

"না দেখে কেন আল্লাহকে বিশ্বাস করব? ইমাম আবু হানিফা ও বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ যুক্তি।"

অদৃশ্যে বিশ্বাস: কেন না দেখে আল্লাহকে বিশ্বাস করতে হবে? (একটি যৌক্তিক ও তাত্ত্বিক গবেষণা) ​মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ, কিন্তু আল্লাহর সৃষ্টি অসীম। কেন আমরা আমাদের এই সীমাবদ্ধ চোখ দিয়ে অসীম সৃষ্টিকর্তাকে দেখতে পাই না, কিন্তু তাকে বিশ্বাস করা অপরিহার্য—তার ১২টি পয়েন্ট নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: ​১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও নাস্তিকদের ঐতিহাসিক বিতর্ক ​ইমাম আবু হানিফার সময় একদল নাস্তিক আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করত। একদিন তাদের সাথে বিতর্কের সময় ইমাম ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করে আসলেন। নাস্তিকরা হাসাহাসি করে বলল, "ভয়ে আসতে দেরি করলেন?" ইমাম উত্তর দিলেন, "আসলে আসার পথে দেখলাম নদীতে কোনো নৌকা নেই। হঠাৎ দেখলাম বনের গাছগুলো নিজে নিজে কাটা হলো, তক্তা তৈরি হলো এবং হাতুড়ি-পেরেক ছাড়াই একটি বড় জাহাজ তৈরি হয়ে গেল। সেই জাহাজটি নিজে নিজেই আমাকে নদী পার করে দিল।" নাস্তিকরা অট্টহাসি দিয়ে বলল, "আপনি কি পাগল? চালক বা মিস্ত্রি ছাড়া জাহাজ তৈরি হওয়া এবং একা একা চলা অসম্ভব!" ইমাম শান্তভাবে বললেন, "সামান্য একটি কাঠের জাহাজ যদি চালক ছাড়া তৈরি হতে বা চলতে না পারে, তবে এই বিশাল সূ...